ডা: আবিদ স্মরণে: এমন বন্ধু কোথাও খুঁজে পাবনাকো আমি

প্রথমেই বলে রাখি এই লিখাটি লম্বা হবে। যার ব্যাপারে লিখছি, তাকে যদি আপনি চিনে থাকেন, তবে সন্দেহ নেই এই লিখাটি আপনি পড়তে চাইবেন। আর যদি না চিনেন, কিন্তু এক বন্ধু আরেক বন্ধুর জন্য কি করতে পারে বা একজন পরোপকারী মানুষ কেমন হতে পারে, তা জানতে চান, তবে এই লিখাটি একটু ধৈর্য নিয়ে পড়তে পারেন।

মৃত্যু সবার জন্য অবধারিত, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমরা মৃত্যর কথা খুব কমই চিন্তা করি। তাই, যদি আমাদের নিকটের কেউ মারা যান, আমরা মর্মাহত হই, কান্নাকাটি করি, কিন্তু কিছুদিন পর আবার ভুলেও যাই। অবশ্যই মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের জন্য তা ভোলা কঠিন হয়। আল্লাহ আল-কোরআনে ওয়াদা করেছেন যে তিনি মানুষের সহ্যের বাইরে কারো উপর বোঝা চাপিয়ে দেননা। তাই পরিবারের সদস্যরাও আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। কিন্তু কিছু মানুষ থাকে যাদের মৃত্যু আমাদের জীবনে এমন এক শূন্যতা তৈরী করে যা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। জীবন থেমে না থাকলেও তাদের অভাব পূরণ হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমনি একজনের মৃত্যু ঘটে গেল শনিবার রাতে যা আমার জীবনে যে শূন্যতা তৈরী করেছে, তা কখনো পূরণ হবার নয়। সেদিন আমার চল্লিশ বছরের বন্ধু ডা: আবু হেনা আবিদ জাফর হঠাৎ করে এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেল। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আশির দশকের মাঝামাঝি হবে। বাংলাদেশের ইসলামী সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রথম সপ্তাহব্যাপী শিক্ষাশিবিরে তার সাথে পরিচয়। সেই থেকে আমাদের একসাথে পথচলা। কিছুদিনের মধ্যেই সাংগঠনিক গন্ডি পার হয়ে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের থেকে আমাদের বাসাই হল তার মুল আস্তানা। বাসায় যখন রান্না হত , আবিদকে ধরে নিয়েই রান্না হত। আম্মা বলে রেখেছিলেন যে আবিদ ছাড়া আর কেউ বাসায় খেলে যেন আগে বলে রাখি যাতে সে অনুযায়ী রান্না হয়। আমার স্কুল বন্ধু ও পাড়ার বন্ধুদের সাথে আবিদের পার্থক্য ছিল এই যে, সে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও বক্তিগত জীবন দুটিতেই আমার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। মেডিকেলে পড়া অবস্থায় তার বাবা মারা যায়। সেই থেকে মা ও ছোট দুই ভাই দুই বোনের সেই অভিভাবক। সবাই থাকত খুলনাতে। আর ঢাকায় তার চলত পড়াশুনা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম।

আল্লাহ বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন প্রতিভা দিয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু একজন মানুষকে এত প্রতিভা খুব বেশি দেননি। ডা: আবিদ ছিল এমন একজন। চিকিৎসক হিসেবে তার বড় বড় ডিগ্রী ছিলনা, কিন্তু তার ডাক্তারী বিদ্যা ছিল অত্যন্ত প্রখর। রোগ সম্পর্কে যেমন ভাল জ্ঞান রাখত, তেমনি রোগীদের খুব ভাল বোঝাতে পারত। সে যখন গ্যাস্ট্রো লিভার ক্লিনিকে কাজ করত তখন প্রায়ই আমি সেখানে যেতাম। অনেক রোগী ও তার আত্বীয়রা বলত যে বড় কনসালটেন্ট নয়, আবিদের সাথে তারা কথা বলতে চায়। এই লিখা যারা পড়বেন, তাদের অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন।

তার সবচেয়ে শখের জিনিস ছিল নাটক। নাটক নিয়ে আমার সাথে তার কার্যক্রম পরে লিখছি। এখানে এটুকু বলে রাখি যে ইসলামী সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নাটকের উপর তারচেয়ে বেশি লেখাপড়া আর কারো ছিল বলে আমার জানা নেই। ঝিনেদা ক্যাডেট কলেজ থেকে সে নাটকের সাথে জড়িত। জনপ্রিয় অভিনেতা তৌকির আহমেদ ঝিনেদা ক্যাডেট কলেজে আবিদের থেকেই নাটক শিখেছিল। বহু অসাধারন মঞ্চ নাটকের পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নাটক নিয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করত। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যখন দেশে গেলাম, তখন আমাকে বলল যে নাটকের উপর একটি বিশবিদ্যালয়ের কারিকুলাম তৈরী করছে। সে অনুযায়ী চ্ট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কোর্স চালাচ্ছিল। বিশিষ্ট নাট্যকার চৌধুরী গোলাম মাওলা আমাকে বললেন যে, গত ১৩ জুন, মৃত্যুর আটদিন আগে দশদিনব্যাপী নাট্য কর্মশালা চালিয়েছিল। আজকে যারা ইসলামী নাট্যাঙ্গনে কাজ করছে, তাদের প্রায় সবাই আবিদের হাতে গড়া।

আবিদের আরেক প্রতিভা ছিল প্রিন্টিং লাইনে। বিভিন্ন বই , ম্যাগাজিন ইত্যাদিতে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাজ করে খুবই উন্নতমানের প্রকাশনা বের করত সে। তার মোনালিসা পাবলিকেশন্স থেকে আল মাহমুদের একটি বই পুরস্কার লাভ করেছিল। প্রিন্টিং ও ডিজাইন লাইনে অনেক সফল কিছু মানুষ আবিদের হাতে তৈরী। এ ব্যাপারেও সে আমার জন্য অনেক করেছে যা পরে লিখছি।

বেশ কিছুদিন থেকে আবিদ সফলভাবে প্যারেন্টিং কোর্স করাচ্ছে। এ ব্যাপারটা আমি আগে জানতামনা। তার সন্তানদের দেখে এটুকু বলতে পারি যে এমন বাবাই সফলভাবে প্যারেন্টিং কোর্স করাতে পারে।

ইংরেজিতে একটি কথা আছে Jack of all trades, master of none, অর্থাৎ কিছু মানুষ আছে যারা সব বিষয়ে কিছু করার চেষ্টা করে, কিন্তু কোনটাতেই তারা তেমন পারদর্শী নয়। আমাদের ডা: আবিদ ছিল এমন ক্ষণজন্মা মানুষ যে ছিল Jack of all trades, master of all । ১৯৯৩ সালে ‘হিমালয় দুহিতার উষ্ণতায়’ নামক আমার একটি ভ্রমন কাহিনী মাসিক কলম পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, যা পরে একটি বই আকারে প্রকাশ পায়। সেখানে আবিদের কথা লিখতে গিয়ে ‘সফদার ডাক্তার’ কবিতার আলোকে কটি লাইন লিখেছিলাম:

আবিদ ডাক্তার
ছোটখাট সাইজ তার
মিটফোর্ডে আছে পড়ে ভাইরে
আমার তোমার কাজ
এর কাজ ওর কাজ
কোন কাজে না তার নাইরে

আমি জানি আমার এই লিখা যারা পড়ছেন তাদের অনেকে এই লাইনগুলোর সাথে ১০০% সহমত প্রকাশ করবেন।

ডা: আবিদের সাথে আমার জীবনের কত যে স্মৃতি তা লিখে শেষ করা যাবেনা। এখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্মৃতি শেয়ার করলাম:

লালঘরে রাতের আড্ডা

১৯৯৭ সাল পর্যন্ত আমরা টিনের ঘরে থাকতাম। আর সে সময়েই আবিদের সাথে সবচেয়ে বেশি উঠাবসা। আমাদের বাসাটি ছিল কয়েকটি টিনের চাল বিশিষ্ট ঘরের সমন্বয়ে। এর মধ্যে আমার ঘরটি ছিল ‘লাল ঘর’, কারন ঘরটির মেঝে লাল রঙের। এই ঘরটি ষাটের দশকের মাঝামাঝি বানানো হয় এবং এই ঘর বিভিন্ন সময় আমাদের বিভিন্ন ভাইয়ের ঘর ছিল। একে একে আমার বড় ভাইয়েরা বিদেশ চলে যাবার পর এটি আমার ঘর হয়ে যায় আর সেখানেই চলত আমার আর আবিদের রাতভর আড্ডা। আব্বা সবসময় ফজরের জন্য ডাকতেন, কিন্তু আবিদ থাকলে ফজরে এসে দেখতেন আমার ঘরের লাইট জ্বলছে। আব্বা অবাক হয়ে একদিন বললেন, “পেটের ভেতর এত কথা যে ঘুম আসেনা?” বেশিরভাগ সময় ফজর পড়েই ঘুমাতাম। এসব হতো আমি যখন আলীগড়ে পড়ি। ছুটিতে আসলে আবিদ মিয়া গাট্টি-বস্তা নিয়ে আমার বাসায় চলে আসত , আর আমার আম্মা বলতেন, “তুমি তো আমার জন্য না, বন্ধুর জন্য দেশে আস। ” কত যে পরিকল্পনা, নাটক নিয়ে কত আলোচনা, আরো কত কিছু নিয়ে সুখ-দু:খের গল্প, এভাবেই কেটে যেত সেসব দিন।

আমার দুটি বই প্রকাশনা

১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমার প্রথম বই ‘বিশ্বের সেরা ক্রিকেট ও ক্রিকেটার’ লিখা শেষ করি। ঠিক হয়, আবিদের মোনালিসা পাবলিকেশন্স থেকে এটি প্রকাশিত হবে। পাণ্ডুলিপিটি আবিদের হাতে ছেড়ে দিয়ে আমি আলীগড়ে ফিরে গেলাম। আর আবিদ তার মামা জাকারিয়াকে নিয়ে বইটিকে রেডি করে, দিনরাত পরিশ্রম করে প্রকাশ করল। জাকারিয়া মামা প্রথিতযশা ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলেন এবং সর্বশেষ মানব জমীনের ক্রীড়া সম্পাদক থাকার পর অনেকদিন হল ইতালিতে বসবাস করছেন। তার ক্রীড়া সাংবাদিকতায় আসার জন্য আমার সামান্য একটু অবদান আছে। আমি সাপ্তাহিক সোনার বাংলার ক্রীড়া সম্পাদক ছিলাম এবং সে সময়েই মামা আমার সাথে কাজ শুরু করে। পরবর্তীতে আমি আলীগড়ে চলে গেলে মামা আমার স্থলাভিষিক্ত হন। যায় হোক, পুরো সময়টি আবিদ ও জাকারিয়া মামা মিলে বইটি বের করল যেখানে আমার কোন অবদান নেই লিখা ছাড়া। অনেকে মনে করতে পারেন, এতে নিশ্চয়ই আবিদ আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে। একদম না। আবিদ কোন পেশাদারী প্রকাশক ছিলনা। শখের বসে করতো টাকা জোগাড় করে। আমার এক বন্ধুর কাছে থেকে এই বইয়ের জন্য ধার নিয়েছিলাম। এই বইটি ক্রীড়া সাংবাদিক মহলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হলেও এর বাজারজাত ঠিকমত হয়নি, তাই বিক্রি থেকেও তেমন কোন আয় হয়নি। কিন্তু এতে আমাদের কারো কোন আফসোস নেই, কারন লাভের জন্য আমরা এই বইটি প্রকাশ করিনি। আবিদ এই প্রকাশনীর নাম মোনালিসা দিয়েছিল অল্প বয়সে মারা যাওয়া তার সবচেয়ে ছোট বোন মোনালিসার নামে। বন্ধুর বই বের করে দেয়া আর তার বোনের নামে প্রকাশ করা, এই দুটি কারণই তার দিনরাত পরিশ্রম করার জন্য যথেষ্ট ছিল।

কিন্তু আমার অন্য বইটি নিয়ে কাজ আবিদ শুধুমাত্র আমার জন্য করেছে। আমার পিএইচডি থিসিস বই আকারে প্রকাশের জন্য ইংল্যান্ডের একটি প্রকাশনা সংস্থার সাথে কথা হচ্ছিল। তারা বলল যে প্রিন্টিং এর জন্য তারা আউটসোর্স করতে চায়। আমি তৎক্ষণাৎ আবিদের সাথে কথা বললাম আর সে সাথে সাথে রাজি হয়ে গেল। এবারও আমি বিদেশে আরামে থাকলাম আর আবিদ দিনরাত পরিশ্রম করে বইটি প্রিন্ট করল। এমনি ছিল আমাদের ডা: আবিদ।

সাইমুমের সাংস্কৃতিক উৎসব ১৯৯০ – উপদ্রুত স্বপ্নেরা

আমার সাংস্কৃতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ১৯৯০ সালে আমি সাইমুমের পরিচালক থাকা অবস্থায় সাইমুমের সাংস্কৃতিক উৎসব যেখানে আমরা চৌধুরী গোলাম মাওলা রচিত ও আবিদ জাফর পরিচালিত কালজয়ী নাটক উপদ্রুত স্বপ্নেরা শিল্পকলা একাডেমীতে মঞ্চস্থ করি। এই নাটিকটি প্রথমে মাওলা ভাই ও চট্টগ্রামের আরেক কিংবদন্তী আহমেদ নাসিমুল হুদা নওশাদ ভাই যৌথভাবে লিখেন ও সেখানে কয়েকবার মঞ্চস্থ করেন। আমি ও আবিদ সেখানে গিয়ে নাটকটি দেখেছিও। যখন আমার হাতে সাংস্কৃতিক উৎসব করার দায়িত্ব পড়ল, স্বাভাবিকভাবে আবিদের শরণাপন্ন হলাম নাটকের ব্যাপারে। তাকে এক প্রকার ব্ল্যাঙ্ক চেক দিলাম যে কোন নাটক যে কোনভাবে সে করতে পারে এবং এ জন্য যা যা করণীয় আমি তা করতে প্রস্তুত। এরকম অফার সে আগে কখনো পায়নি আর আমি জানি এমন অফার দিলে আবিদ কি করতে পারে। আবিদ সিদ্ধান্ত নিল যে উপদ্রুত স্বপ্নেরা নতুন আঙ্গিকে করবে এবং মাওলা ভাইকে দিয়ে এর পুনর্লিখন করা হবে, যা ৪৫ মিনিটের নাটককে আড়াই ঘন্টায় পরিণত করবে।

যেই কথা সেই কাজ। মাওলা ভাই তখন দৈনিক সংগামে কাজ করেন আর থাকেন তার উল্টা দিকে এক মেসে। এবার আবিদের পাশাপাশি মাওলা ভাই আমাদের বাসার সদস্য হয়ে গেলেন। আবিদের নির্দেশনায় মাওলা ভাই এই নাটক নতুন করে লিখা শুরু করলেন। অনেক নতুন চরিত্র যোগ করা হল। এদিকে আবিদ অভিনেতা অনুসন্ধানে ব্যস্ত। ঠিক এমন সময় সাইমুমের সাবেক পরিচালক তারেক মনোয়ার ভাই এসে দাবী করলেন তাকেও নাটকে নিতে হবে। কি মুশকিল ! তিনিতো কখনো নাটকে অভিনয় করেননি। আবিদ চিন্তা করে মাওলা ভাইকে বলল যে ফেক্টরি ইউনিয়নের নেতা হিসেবে একটি চরিত্র বানাতে হবে যেটা তারেক ভাইয়ের কথা বলার স্টাইলের সাথে মিলে যায়। এর ফলে তাকে অভিনয় শেখানো লাগবেনা, শুধু নিজের মত করে কথা বললেই হবে। এমন কত ঘটনা !

নাটকে আমি কখনো অভিনয় করিনা তবে আবিদ আমাকে সাউন্ড ডাইরেকশন শিখিয়ে সেই দায়িত্ব আমাকে দেয়। নাটকের একটি দৃশ্যে কুকুরের আওয়াজের প্রয়োজন হয়। আমরা ঠিক করি আমাদের পাড়ার মোড়ে সবসময় কিছু কুকুর থাকে, সুতরাং ওদের কাছ থেকে আওয়াজ রেকর্ড করব। যথারীতি রেকর্ডার চেপে হাটছি ওদের ঘেউ ঘেউয়ের আশায়। কিন্তু একি ? যেই কুকুরগুলো কাউকে দেখলেই আওয়াজ তোলে, সেদিন তারা একেবারে চুপ। এখন কি করি? আবিদের মাথায় বুদ্ধি ঠাসা। সে মাওলা ভাইকে বলল একটু ঘেউ ঘেউ করে আওয়াজ করতে। মাওলা ভাই একবার আওয়াজ তুলতেই সবগুলো কুকুর একসাথে আওয়াজ তুলল আর আমরা তৃপ্তির সাথে তা রেকর্ড করলাম। এই নাটকে যারা অভিনয় করেছে আর যারা কুশীলব ছিল তারা আবিদকে কোনদিন ভুলতে পারবেনা।

সেই দিনগুলির প্রতিটি মুহূর্ত আমার মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। আবিদের সাথে মোটর সাইকেলে ঘুরা, রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময় আবিদের হাড্ডি খাওয়া নিয়ে তাকে খোটা দেয়া, আর মাঝে মাঝে ঝগড়া করা , সেই দিনগুলো নিয়ে আবিদের সাথে পরবর্তীতে কত স্মৃতিচারণ করেছি। এখন আর সেটাও করতে পারবনা।

২৭ ফুট লম্বা চিঠি

এখনকার জেনারেশন বুঝতে পারবেনা ৯০ দশকে চিঠির মূল্য। আলীগড়ে পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের ছেড়ে খারাপ লাগত। তাই সবাইকে চিঠি লিখতাম ও এর জবাব আশা করতাম। আমার পাড়ার বন্ধু দিপু নিয়মিত লিখত। কিন্তু আবিদ অলসতা আর বিভিন্ন ব্যস্ততায় লিখতনা। এ নিয়ে যখনি মন খারাপ করতাম, তখন সে বলত ‘একদিন লিখে সব পুষিয়ে দেব’ । তা সে এমনভাবে পুষিয়ে দেবে তা কল্পনাতেও ভাবিনি। একদিন রুমে এসে দেখি একটি বড় খাম। হাতের লেখা দেখে বুঝলাম আবিদ পাঠিয়েছে। খুব খুশি হলাম। কিন্তু অবাক হলাম খামটি ধরে কারন ভেতরে কেমন গোল একটা জিনিস। খুলে দেখি রোল করা একটি বান্ডিল। রুমের বাইরে এসে খোলা শুরু করলাম। একি? এ দেখি শেষই হয়না। ইতিমধ্যে আসে পাশের রুম থেকে অনেকে বের হয়ে মজা দেখছে। আমার রুম থেকে আর কয়েকটি রুম পর্যন্ত যেতে হল কাগজের রোলটি খোলার জন্য। একজন মাপার ফিতা নিয়ে এল। দুজন দু প্রান্ত ধরল আর আমি মাপা শুরু করলাম। মোট সাতাশ ফুট লম্বা চিঠি! পড়া শুরু করলাম ঘড়ি দেখে। পৌনে তিন ঘন্টা পর চিঠি পড়া শেষ হল। এবার বলেন, এমন চিঠি কোন বন্ধুকে কে লিখেছে? আমার ভাগ্য নিয়ে হিংসে হচ্ছেনা?

আমার ক্রিকেট সংগঠনে ও সাংবাদিকতায় অবদান

আবিদ খেলাধুলা তেমন করতনা। কিন্তু আমি সবসময় খেলার পাগল। কি করবে আর, আমার সাথে তাকেও তাল মেলাতে হত। আমার ক্রিকেটের বই সে বের করেছে। এর পর ২০০২ সালে আমি প্রথমবারের মত আন্তঃ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করলাম। সেই টুর্নামেন্টের স্যুভেনির করার দায়িত্ব সে নিল। আমার সাথে বিজ্ঞাপন কালেকশনে দৌড়াদৌড়ি করল, আর রাতের পর রাত খেটে সঠিক সময়ে একটি অসম্ভব সুন্দর স্যুভেনির বের করল যা দেখে সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল। এর এক বছর পর বাংলাদেশেরখেলা নামে প্রথম বাংলায় ক্রীড়া ওয়েবসাইট আমি, জাকারিয়া মামা ও কয়েকজন ক্রীড়া সাংবাদিক মিলে গঠন করলাম। আবিদ আমাদের পাল্লায় পরে তাতে ইনভেস্ট করল ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ মিলনায়তনে এর আড়ম্বরপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পুরো আয়োজনে নেতৃত্ব দিল। এর প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আমি লাইমলাইটে আসলাম, টিভিতে সাক্ষাৎকার দিলাম। আর আবিদ পেছন থেকে সব করল। আবিদ এমনি ছিল। শুধু দিয়েই গিয়েছে, নেয়নি কিছুই।

শেষ কথা

আর কত লিখব? আমাদের বন্ধুত্ব নিয়ে লিখা শেষ করা যাবেনা। যখন তাকে চেয়েছি, তখনি পেয়েছি। সব ফেলে এসেছে আমার ডাকে। আমার ব্যক্তিগত জীবনে তার পরামর্শ আমার অনেক কাজে লেগেছে। ইংল্যান্ডে চলে আসার পর যোগাযোগ কিছুটা কমে যায়। আমার ওয়াটস্যপ মেসেজের জবাব সবসময় দিতে পারতোনা নানা ব্যস্ততায়। কিন্তু যখন প্রয়োজন হয়েছে, সব ফেলে আমার কাজ করেছে। আমার ভাই গুম থেকে ফিরে আসার পর তার স্বাস্থ্যের আপডেট, জুলাই অভুত্থানের গল্প শুনতে চাই বলে তার বাসায় আমাকে যেদিন দাওয়াত দিল, তখন দুজন সমন্বয়ককে ডেকে আমার সাথে কথা বলার ব্যবস্থা করা, এমনকি ডাকসুর ভিপি সাদেক কায়েমের সাথে সাক্ষাতের আয়োজন করা (যদিও শেষ পর্যন্ত সাদিক কায়েম সময় দিতে পারেনি) সব কাজে আমার পাশে ছিল আবিদ। শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক নুরুর রহমান বাচ্চু, যে আবিদের হাতে গড়া আরেকজন, তাই যথার্থ তার ফ্রেসবুকে লিখেছে , “কারণে-অকারণে, পারিবারিক অসুস্থতায় এখন কাকে ফোন দিব আবিদ ভাই?” যারা আবিদকে চেনে, তারা এই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে বোঝে।

আর পাবনা আবিদকে এটা ভাবতেই মনটা অস্থির হয়ে যায়। সে চলে গেল অজানার দেশে। আর আমাকে ফেলে গেল অসহায় করে। এমন বন্ধু আমি কোথায় পাব? কাকে ফোন করে মনের কথা বলব? কার সাথে স্মৃতিচারণ করব? সে নিজেকে বলত অধ্যাপক গোলাম আজমের সপ্তম ছেলে হিসেবে। সেই ভাইটিকে হারালাম। আমার এই প্রানপ্রিয় ভাই ও বন্ধুকে আল্লাহ হেফাজতে রেখ। স্বার্থপরের মত তার কাছ থেকে শুধু নিয়েছি, তেমন কিছু দিতে পারিনি মনের ভালবাসা ছাড়া। আমার মত অনেক মানুষ আছে আবিদের কাছে ঋণী। তার বিনিময়ে আল্লাহ তুমি তাকে জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দিও। তার প্রিয়তমা স্ত্রী ও অসম্ভব মেধাবী চার সন্তানকে আগলে রেখ। ওদের জন্য খুব চিন্তা হয়। আল্লাহ তুমি তাদের অভিভাবক হয়ে যাও।

11 thoughts on “ডা: আবিদ স্মরণে: এমন বন্ধু কোথাও খুঁজে পাবনাকো আমি”

    • জাজাকাল্লাহ খায়রান, মহান আল্লাহ ডা: আবু হেনা আবিদ জাফর ভাই কে জান্নাতুল ফিরদৌস নসিব করুন

      Reply
    • আমীন। আল্লাহ তোমাদের ধৈর্য দিন এ দোয়া সবসময় করি।

      Reply
  1. মাশাআল্লাহ- ডা: আবু হেনা আবিদ জাফর আমার নাটকের উস্তাদ ছিলেন, সাইমুমের নাটক, বাংলা সাহিত্য পরিষদের নাটক, আরো কতো কাজে আমার অভিভাবক হিসাবে পেয়েছি তাঁকে, আজ খুবই মনে পড়ছে এই মহান নায়ক কে যিনি নেপথ্য থেকে গড়েছেন হাজারো অভিনেতা, আমার সৌভাগ্য হয়েছিল তার সান্যিধ্য লাভের, কিছু হলেই ফোন করতো, মুস্তাগিছ এটা কেমন হলো দেখোতো, তার প্রোফাইলের জন্যবেশ কিছু পুরোনো ছবি সংগ্রহ করে দিলাম এবার ঈদে, ডা: মোহাম্মদ রেদওয়ানুর রহমান ভাই নাটকের স্ক্রীপ্ট পেলেই বলতো মুস্তাগিছ ভাই আপনি একটু কষ্ট করে আবিদ ভাই স্ক্রীপ্ট দেখিয়ে নিন, তিনি অনুমতি দিয়েছন কি না সেটা আবার তাঁকে জিজ্ঞেস করে শুনে নিত, কি অসাধারণ অমায়িক মানুষ ছিলেন নাপকের ব্যাপারে যখনই বলতাম সংগে সংগে রাজি হয়ে যেতো , আজ তিনি নেই কিন্তু সব সময়ই তাঁকে খুব মনে পড়ছে, আপনি এবং আবিদ ভাই একই প্রকৃতির মানুষ আগে সত্যি মনে করতাম আপনারা দুজনেই মনে হয় আপন ভাই কিন্তু পরে জানতে পারি দুজন দ্বীনি ভাই , আপনার আরো অনেক কথা আছে যেটা আমি জানি আশা করি এটি নিয়মিত লিখবেন, কারণ আবিদরা খুব বেশী জন্মায় না, তাদের ডেডিকেশন, ত্যাগ তিতিক্ষা কেউ না জানুক আপনি জানেন, নিরবে তিনি সুস্থ ধারার সংস্কৃতির নেপথ্যের নায়ক হিসেবে কাজ করে গেছেন৤ সেলুট হে মহান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতাকে , আপনার ‍‍ঋন আমরা কখনো শোধ করতে পারবো না৤ ধন্যবাদ ড. সালমান আল আজমী ভাই কে জাজাকাল্লাহ খায়রান৤ মহান আল্লাহ ডা: আবু হেনা আবিদ জাফর ভাই কে জান্নতের সু উচ্চ ম‍র্যদা দান করুন-আমিন

    Reply
    • ধন্যবাদ মুস্তাগিজ। আবিদ নিয়ে স্মৃতিকথা লিখে শেষ করা যাবেনা।

      Reply
  2. আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তালা আবিদ ভাইকে ক্ষমাপ্রাপ্তদের মধ্যে শামিল করুন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। হে আল্লাহ আবিদ ভাইয়ের পরিবারকে রহমতের চাদরে ঢেকে রাখুন।

    Reply
  3. আবিদ ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমিও খুবই স্মৃতিকাতর হয়ে যাই। খুলনার খালিশপুরস্থ ভৈরব নদীর তীর ঘেষে বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম জউট মিলস এর কলোনীতে অবস্থিত ক্রিসেন্ট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বড় ছেলে আমার স্কুলের বড় ভাই ডা: আবিদ, আমি ক্রিসেন্ট স্কুলের ১৯৮৩ এস এস সি ব্যাচ, বি এল কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে এইচ এস সি পাশ করে উচ্চ শিক্ষার্থে ঢাকায় এসে প্রথমে আবিদ ভাইয়ের রুমে উঠি, এরপর ডেমরা থানার ধলপুরে লজিং এ যাই। এরপর থেকে শিবিরের স্কুল বিভাগে ও ফুলকুড়ির সাথে কাজ করার সুযোগ পাই। ১৯৮৯ সালে সদস্য হয়ে মহানগরী স্কুল বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুবাদে সাইমুমের সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের সাথে আমার ভাল সম্পর্ক।
    উপদ্রুত স্বপ্নেরা নাটকে আমার অভিনয় করাও আবিদ ভাইয়ের বড় অবদান। ঢাকাতে আবিদ ভাই আমার অবিভাবক ছিলেন।
    এই লেখা পড়ে আমি অশ্রুসিক্ত হয়ে সালমান ও আবিদ ভাইয়ের জন্য অনেক বেশি দোয়া করেছি।
    আমি এখন ঢাকা মহানগরী দক্ষিনের আইনজীবী বিভাগের শুরা-কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।
    বুয়েটের কেন্দ্রিয় জামে মসজিদে নামাজে জানাজায় উপস্থিত ডা: আবিদের আশির দশকের বহু গুনমুগ্ধ সাথীরা একই কথার সাক্ষী দিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেছে। আমার মত অনেক মানুষ আছে আবিদের কাছে ঋণী। তার বিনিময়ে আল্লাহ তুমি তাকে জান্নাতে একটি ঘর বানিয়ে দিও। তার প্রিয়তমা স্ত্রী ও অসম্ভব মেধাবী চার সন্তানকে আগলে রেখ। ওদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আল্লাহ তুমি তাদের অভিভাবক হয়ে যাও।
    আল্লাহুম্ম আমিন

    Reply

Leave a Comment