বাংলা ভাষায় ভাষাবিজ্ঞানীর অভাব

আমার PhD বাংলাদেশের বাংলা বিজ্ঞাপনের ভাষা নিয়ে। পরবর্তীতে যখন bilingualism-এ গবেষনা শুরু করলাম, তখনো বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেছি। বর্তমানে popular culture-এর ভাষা নিয়ে কাজ করছি। এখানেও বাংলা ভাষার ওপরেই গবেষনা করে যাচ্ছি। খুব খারাপ লাগে যখন দেখি বাংলা ভাষায় ভাষাবিজ্ঞানীর এতো অভাব। ভাষাবিজ্ঞান যখন এতটা প্রসার লাভ করেনি তখন বাংলা ভাষা ডঃ মোহাম্মদ শহীদুল্লার মতো ভাষাবিজ্ঞানী উপহার দিয়েছিল, অথচ এই মহাপন্ডিতের উত্তরসুরিরা তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলোনা – এটা খুবই আফসোসের বিষয়।

UNESCO যখন মহান একুশে ফেব্রুয়ারী কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষনা করলো, তখন খুব আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম এই ভেবে যে বাংলা ভাষায় গবেষনা অনেক বেড়ে যাবে। কিন্তু সে আশা এখোনো পূরন হলোনা। আর হবেই বা কিভাবে? বাংলা ভাষায় গবেষনা করতে হবে বাংলা ভাষাভাষিদেরকেই। কিন্তু বাংলাদেশে গবেষনার পরিবেশ কতোটুকু? বিশ্ববিদ্দালয়গুলোতে গবেষনা কতটুকু হয়? গবেষনা হলে রাজনীতি হবে কিভাবে? তাছাড়া ভাষার উপর গবেষনার জন্য চাই পরিপূর্ন ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ। আজ পর্যন্ত তা দেখতে পেলাম্ না। ঢাকা বিশ্ববিদ্দালয়ে এমন একটি বিভাগ আছে বটে তবে তাতে কি হয় তা আল্লাই জানেন। আলীগড় মুস্‌লীম বিশ্ববিদ্দালয়ে ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয় ১৯৬৯ সনে। তার মানে এই একটি ব্যাপারে আমরা আলিগঢ় থেকে ৫০ বছরেরও বেশী পিছিয়ে আছি। এই দুঃখ রাখব কোথায়?

আমি যখন দেশে ছিলাম তখন গবেষনার কোনো পরিবেশ পাইনি। কত কষ্ট করে যে PhDটা শেষ করেছি তা আমি জানি আর আল্লাহ জানেন। যে বিশ্ববিদ্দালয়ে অধ্যাপনা কর্‌তাম তাদের সহায়তা তো পাইইনি, বরং ভারতে গিয়ে থিসিস লিখার জন্য যে সময় লেগেছে, তার ফলে আমার বেতন পর্যন্ত কাটা হয়েছে। আট বছর দেশে শিক্ষকতা করেছি। শুধুমাত্র শিক্ষকতায় অভিজ্ঞতা ছাড়া আর কোনো কাজে আসেনি এ সময়। হ্যঁ, PhD টা কর্‌তে পেরেছি বটে, তবে এর জন্য আমার নিজের চেষ্টা, আমার শ্বশুর ও আমার স্ত্রীর অনুপ্রেরনা আর আমার supervisor-এর আন্তরিক সহযোগীতা ছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের কনো অবদান নেই। যখন ইংল্যন্ডে আসলাম, তখোন একেবারে নতুন করে শুরু করতে হলো। দেশে থাকলে হয়তো এর মধ্যে professor হয়ে যেতাম। অথচ এখানে এখন আমি একজন Senior Lecturer। তবে এতে আমার কোনো আফসোস নেই। গত ক বছরে এখানে আমার যে research profile হয়েছে, তা বাংলাদেশে কখনও হতোনা। তাছাড়া এদেশে বাংলাদেশের বড় বড় বিশ্ববিদ্দালয়ের শিক্ষকদের দেখ্‌ছি কি করছেন। একটি British university-তে শিক্ষক হতে পারা সহয নয়। আল্লাহ যে সে সুযোগ আমার জন্য করে দিয়েছেন, সে জন্য তাকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষাও আমার নেই।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে”। আমাকেও তাই করতে হবে। বাংলা ভাষায় গবেষনা চালিয়ে যেতে হবে, কেঊ এগিয়ে আসুক আর না আসুক। আমার বিশেষজ্ঞতা বাংলা ভাষার ব্যকরনের উপর নয়। আমি একজন সমাজভাষাবিজ্ঞানী (sociolinguist)। আমি আমার জগতে কাজ করে যাব, আর এতে যদি বাংলা ভাষায় গবেষনার ক্ষেত্রটা একটু সমৃধ্ব হয়, তবে তার চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে? আর এ লিখা পড়ে যদি একজন বাংলা ভাষাভাষি বাংলায় গবেষনা করতে উদবুদ্ধ হয়, তবে তা হবে আমার জন্য খুব্‌ই খুশীর ব্যাপার হবে।

4 thoughts on “বাংলা ভাষায় ভাষাবিজ্ঞানীর অভাব”

  1. লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ভাষা কোন কোন বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করা যায় তা উদাহরণসহ লিখলে পাঠক হিসেবে উপকৃত হতাম। ধন্যবাদ আপনার লেখা অব্যাহত থাকুক।

    Reply
    • আমার ফেসবুকে নিয়মিত ভাষার উপর কথা বলি। আজ ভাষা ও পরিচয় নিয়ে কথা বলব। বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় হবে। সে আলোচনার পর কোন প্রশ্ন থাকলে করতে পারবেন।

      Reply
      • সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে আপনার বাংলা ভাষা নিয়ে গবেষণায় সাফল্য কামনা করছি। যেসব সমালোচনা তুলে এনেছেন তার গভীরতা অনেক। নতুন প্রজন্মের জন্য এর সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা আপনার রচনায় উঠে আসলেই তারা গবেষণায় উদ্ধুদ্ধ হবে।

        Reply
        • ধন্যবাদ। ইনশা আল্লাহ এসব বিষয় নিয়ে কিছু লিখব তরুণ প্রজন্মের জন্য। তবে এসব কথা শোনার জন্য খুব বেশী লোক আছে কি?

          Reply

Leave a Comment